দৃশ্যকাব্যে ফররুখ আহমেদ
মাত্র ৪০ টাকায় বাংলাদেশের যে কোন প্রান্তে বই পৌছে দেয়া হয় 
২-৫ দিনের মধ্যে বিতরণ যোগ্য

দৃশ্যকাব্যে ফররুখ আহমেদ

প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারী, ২০১৬
১১৮.০০ ১৯০.০০
 

ফোনে অর্ডার দিতে কল করুন

০১৭২১-৯৯৯-১১২

image01
image02
image01

১। আপনি ফোন বা অনলাইন এর মাধ্যমে অর্ডার করার পর কিতাব ঘর আপনার সাথে যোগাযোগ করবে এবং আপনার বিলি ঠিকানা নিশ্চিত করবে ।

২। SMS এর মাধ্যমে আপনাকে আপনার অর্ডার নং ও অর্ডার এর মুল্য পাঠানো হবে ।

৩। কিতাব ঘর এখন ঢাকা ও এর আশেপাশে ক্যাশ অন ডেলিভারী ও কুরিয়ার সার্ভিস এর মাধ্যমে বই পাঠাচ্ছে । এবং ঢাকার বাইরে কুরিয়ার সার্ভিস এর মাধ্যমে বই পাঠাচ্ছে ।

৪। বই পাঠানোর ১-২ দিনের মধ্যে আপনারা আপানদের ঠিকানাতে বই পেয়ে যাবেন। কিন্তু বাংলাদেশের অনেক গ্রাম বা প্রত্যন্ত এলাকা যেখানে কোনো কুরিয়ার সার্ভিস এর সেবা নাই , সেখানকার জন্য জেলা বা থানা শহরের কুরিয়ার সার্ভিস অফিস হতে বই সংগ্রহ করতে হবে ।

৫। বইয়ের মুল্য bKash, ডাচ বাংলা মোবাইল বা ক্যাশ অন ডেলিভারী এর মাধ্যমে প্রদান করা যাবে । বাংলাদেশের যে কোনো প্রান্তে ৪০ টাকায় বই পৌছে দেয়া হবে ।

৬। যারা বাংলাদেশের বাইরে থেকে অর্ডার করবেন, তাদের জন্য ডেলিভারী চার্জ বইয়ের ওজন ও দেশের উপর নির্ভর করবে । বিভিন্ন দেশের ও বিভিন্ন পরিমানের ডেলিভারী চার্জ দেখতে এখানে ক্লিক করুন ।

অনুগ্রহ করে কিতাবঘর ডট কমে লগইন করুন । লগইন

"দৃশ্যকাব্যে ফররুখ আহমদ"।... কবি মুসা আল হাফিজের.... এ বইটি বাংলা সাহিত্যে একটি নতুন সংযোযোন। তার অসাধারণ বিশ্লেষণে ইসলামি রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদকে নতুনভাবে চেনা যায়। বইটিকে কেউ কেউ আল্লামা আবুল হাসান আলি নদভি রচিত রাওয়াইয়ে ইকবাল-এর সঙ্গে তুলনা করছেন। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে মহা সত্যের বাঁশি ও এ বইটির প্রকাশনা উৎসবে অধ্যাপক আব্দুল্লা আবু সাঈদ প্রায় এক ঘন্টা আলোচনা করেছেন। বইটি সম্পর্কে লেখক নিজে যা বললেন_ "গতকাল 'দৃশ্যকাব্যে ফররুখ আহমদ ' সম্পর্কে লিখেছিলাম 'সাহিত্য সমালোচনায় গ্রন্থটি বিশেষ চোখ ও চেতনার ধারক বলে প্রমাণিত হবে।ফররুখ আহমদের কাব্যনাটকের নন্দনতাত্তিক আলোচনায় বইটি নতুন রুচি ও মাত্রা সংযোজন করবে।' কেন এমন লিখলাম? লিখলাম বিতর্ক সৃষ্টির জন্য।যাতে প্রশ্ন দেখা দেয়।ভালো লাগলো, প্রশ্ন উঠেছে দেখে। একজন কবির নবউত্থান বহু শ্রম, চিন্তা ও বিতর্কের পথ মাড়িয়েই হয়।এ জন্য প্রচল ধারার বিশ্লেষণ ও চিন্তার সীমাবদ্ধ দরোজায় আঘাত করতে হয়।' নতুন চোখ ও চেতনার' উন্মোচন জরুরী হয়ে উঠে। এটা ঘটে বিচারের 'নবমাত্রা ' ও 'রুচির' স্বতন্ত্র প্রস্ফোটনের পথ ধরে। দৃশ্যকাব্যে ফররুখ আহমদ এ ক্ষেত্রে যে স্বাতন্ত্র্ ধারণ করে, তাহলো বইটি লেখা হয়েছে কবির কাব্যনাটকের সমালোচনায় ।( ফররুখের কাব্যনাট্য নিয়ে বাংলা ভাষায় কোনো বই লিখা হয়নি।জানা থাকলে নাম বলুন) এ হচ্ছে বড় এই কবিকে নানা কৌণিক বিচারের উদ্ভোধন। ফররুখের কাব্যনাট্যের সিদ্ধিকে অবলীল অস্বীকৃতির যে গড্ডালিকা, এ হচ্ছে এর উজানযাত্রা। বইটি এর চেয়ে বড় যে বিষয়ের প্রস্তাবক, তা হলো ফররুখ অাহমদের প্রেক্ষাপট গোটা বাংলা সাহিত্য। কিন্তু তাঁকে সেই প্রেক্ষাপটে বিচার করা হয়নি।চল্লিশের কবিদের মধ্যে তাকে পঙক্তিভূক্ত করা হয়।সাধারণত দায়সারা গোছে। সর্বোচ্ছ, আবদুল মান্নান সৈয়দ তাকে চল্লিশের সেরা বলে আখ্যা দিয়েছেন।( এ জন্য তাকে অনেক কটুক্তি সইতে হয়েছে) কিন্তু হাজার বছরের বাংলা কবিতায় ফররুখের অবস্থান কোথায়? এ বিচার শুরু হয়নি আজ অবধি। বইটি সেই বিচারের প্রস্তাব করেছে এবং বিচারের একটি ভাষ্য দাঁড় করিয়েছে।তার পক্ষে প্রমাণাদি সাধ্যমতো পেশ করেছে। জানি, এটা প্রবল বিতর্ক জন্ম দেবে। অধিপতি বুদ্ধিজীবী মহল তেেলবেগুনে আগুন হতে পারেন।কিন্তু কাজটি তো করতেই হবে।সাহিত্যের স্বার্থে,জাতির স্বার্থে। ফররুখ কি পাকিস্তানপন্থী ছিলেন? সবাই তো তাই বলে। কিন্তু ফররুখের কবিতায় যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আওয়াজ উঠলো ষাটের দশকেই!! মুক্তিযুদ্ধে তিনি ছিলেন না।যেমন ছিলেন না শামসুর রাহমান।উভয়েই একাত্তরে পাকিস্তানিদের চাকরি করেছেন। কিন্তু শামসুর রাহমানের কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ আছে।অতএব তাকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দেখা হচ্ছে। এখন যদি ফররুখের কবিতায় স্বাধীনতার স্পষ্ট সুর ধ্বনিত হয়, তাকে অামরা কীভাবে বিচার করবো? বইটি দেখিয়েছে ফররুখের কবিতা কীভাবে স্বাধীনতার কথা বলছে। পরিস্থিতির রক্তচক্ষুর সামনে একটি বই যখন উজানস্রোতে এসব কাজ করে, তখন বইটির নতুন চোখ ও রুচির বিষয়ে একটি জানান দেয়া দরকার ছিলো। সে কাজটির কারণে যারা আহত হয়েছেন, আল্লাহ তাদের হায়াত দারাজ করুন।

দৃশ্যকাব্যে ফররুখ আহমদ: চেতনার অনন্য উন্মীলন ড.মো.রিজাউল ইসলাম মুসা আল হাফিজ একজন কবি। সময়ের বোধিত কবি। একজন কবিপুরুষকে কাব্য-সমালোচনায় বিষয়-প্রকরণ উপলব্ধিতে যে প্রজ্ঞা, প্রকাশ- শীলনে ভাষার উপর যে নিষ্ঠা-নৈর্ব্যক্তিকতার নৈয়ায়িক প্রতীতী থাকা প্রয়োজন, সেটা সহজে আত্মস্থ করতে পেরেছেন। এর যথার্থ প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায় তাঁর সদ্য প্রকাশিত ‘দৃশ্যকাব্যে ফররুখ আহমদ’ গ্রন্থে (২০১৬)। সাম্প্রতিক কাব্য-সমালোচনার রুগ্ন-রোদ্দুরে এটা বোধ করি শরৎ প্রভাতের নির্মল জ্যোতি। যার দীপ্তিতে তৃপ্তি আছেÑপীড়ন যাতনা নেই। প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে ফররুখ আহমদ কাব্যোমোদী-পাঠক-সমালোচক দ্বারা নানাভাবে চর্চিত। এ প্রচেষ্টার দীর্ঘমিছিলে ‘দৃশ্যকাব্যে ফররুখ আহমদ’ বিশিষ্টতার দাবিদার। একজন ফররুখ আহমদ কাব্যে,দৃশ্যকাব্যে,নাটকে, কাব্যনাটকে দিনবদলের পালায় আজও কীভাবে শাশ্বতিক-সতেজ, তার শতদালিক স্বত:স্ফূর্ত উচ্চারণ এ গ্রন্থটি। মোট দশটি প্রবন্ধের কলেবরে সীমায়িত এর অবয়ব-সংস্থান। প্রবন্ধগুলোর অধিকাংশ আকারে বেশ ছোট। তবে বিষয় প্রকাশে স্ফটিক দানার মত স্বচ্ছ। ‘বাংলা কবিতার ডাহুক’ গ্রন্থের প্রথম প্রবন্ধ।এর প্রেক্ষণ-পাঠে রয়েছে ফররুখ কবিমানসের ঈপ্সিত স্পর্শÑ খুব সংক্ষিপ্ত অবয়বে । হাসান হাফিজুর রহমান ,সৈয়দ আবুল মকসুদ, মুহম্মদ নুরুল হুদা, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আবু হেনা মোস্তফা কামাল , জিল্লুর রহমান সিদ্দীকি,আবুল ফজল,শামসুর রাহমান,বিপ্রদাশ বড়–য়া,সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম প্রমূখ ব্যক্তিত্ব ফররুখ কবিমানসের বিচিত্র কৌণিকতা বিশ্লেষণে যে দৃঢ়- সংযম বাণীভাষ্য নির্মাণ করেছেন, তার সারোদ্ধার এখানে সহজলভ্য। ফররুখ সাহিত্যাদর্শ,প্রকরণচেতনা,নিসর্গ ও প্রতীকী ভাবনা,ঐতিহ্যবোধ, বাকপ্রতিমার বাক্সময় প্রকাশ ইত্যাদি এখানে উদ্ধৃত করেছেন। বিদগ্ধজনের পর্যালোচনা উদ্ধৃত করার পর ফররুখ সম্পর্কে নতুন করে আলোচনা করার কথা নয় । তবে মুসা আল হাফিজের অন্তরপ্রদেশে নতুনবোধের যে চর জেগেছে, সেখানে তরতর করে বেড়ে উঠেছে উদ্যোম সতেজ ঘাস; শুধু তাই নয়, দিগন্তের নীল-নীলিমার দেয়াল সেঁটে শব্দমালার নতুন ঈশারায় ফররুখের ‘সাত সাগরের মাঝি’,‘বন্দরে সন্ধ্যা’,‘শিকার’,‘ডাহুক’ ও দরিয়ার শেষ রাত্রি’প্রভৃতি কবিতা সৃষ্টিসুখের উল্লাসে নতুন করে দুলে উঠেছে। কলাবাদীরা যার নাম দিয়ে থাকেন ‘সাবলাইম’ । ফররুখের কবিমানস ও নন্দনচেতনা উপলব্ধিতে প্রবন্ধকার ধ্রুপদী-রোমান্টিক। মুসা আল হাফিজের মননবিশ্বে ফররুখ নন্দিত হয়েছেন এভাবে : ‘শিল্পের মাধুর্যে সাঁতার কাটছে তাঁর কবিতা,প্রকরণের চমকে বর্ণিল তাঁর সৃষ্টিরাজ্য। তাঁর উপজীব্যে আছে বৈচিত্র,তাঁর ভাষার বুননে আছে চমৎকারিত্ব ,তাঁর উচ্ছাসে আছে বোধের অতলতা,তাঁর উদ্ভাবনায় আছে দিগন্তের প্রসার,তাঁর সত্তায় আছে বৈশ্বিক সৌন্দর্যলোক,তাঁর অনুভবে আছে পরিচ্ছন্ন পরিচর্যা, তাঁর অভিব্যক্তিতে আছে শক্তি ও সংহতি। তাঁর অভিজ্ঞানে আছে তৃপ্তিহীন অন্বেষা’ (হাফিজ:২০১৬:১৪) ফররুখ আহমদ তাঁর কবিতায় যে ‘হেরার রাজতোরণ’এর উল্লেখ করেছেন, লেখক সে তোরণ পেরুলেই দেখতে পান :‘চমকপ্রদ ছন্দের গীতলতা বাতাসে বাজছে,প্রগাঢ় চেতনা ও প্রকৃতির যৌথ কনসার্ট জমেছে,অন্তরলোকের উদ্বোধনী সুর অপূর্ব কলতান তুলছে, প্রেম ও নান্দনিকতা অভিনব পেখম বিস্তার করছে ,দুঃসাহসী যাত্রীর হাতে অজানার দরোজা উন্মোচিত হচ্ছে,মৃত্যু মাতাল সমুদ্র পরাজয় মানছে,...উচ্চারিত হচ্ছে তাওহীদের আজান,উদ্ভাসিত হচ্ছে মানব কল্যাণের বিভা,উন্মোচিত হচ্ছে সুনিকেত আদর্শবাদ।’(হাফিজ:২০১৬:১৪) গ্রন্থকার এভাবেই নরম-সোনালি আলোর ¯িœগ্ধ উত্তাপে ফররুখকে উপলব্ধি করতে চান। তাঁর কবিতার কৌণিকতার শেষ বিন্দুকে স্পর্শ করতে চান। যেখানে মানবিকতা আর মুসলিম রেঁনেসা হাত ধরাধরি করে মেলবন্ধন রচনা করেছে। যার বহু বর্ণিল ভাষিকরূপ এভাবে দানা বেধে উঠে:‘ফররুখ আহমদের কবিতা মানেই একটি নিপুণ কুশলী হাত অঙ্কন করছে মানবিকতার মুখ। তাঁর কলমে গাঢ় হয়ে উঠছে বিস্ময়কর প্রতীক,আপন আত্মায় জাগ্রত উপমা,আপন চরিত্রে উদ্দীপ্ত ইমেজ,আপন বিদ্যুতে জ্বলন্ত পটভূমি। যা সমাজ চেতনায়, রোমান্টিকতায় ও স্বতন্ত্র সংস্কৃতি চেতনায় উদ্দীপিত। যা যুক্ত করে দেয় সমাজ চেতনার গায়ে উদাত্ত রোমান্টিকতার ডানা,রোমান্টিকতার ডানায় স্বতন্ত্র সংস্কৃতি চেতনার পালক। সে যখন উড়াল দিলো,তখন হেসে উঠলো মহার্ঘ মুসলিম রেঁনেসা।’ (হাফিজ:২০১৬:১৫) দ্বিতীয় প্রবন্ধের নাম ‘তাঁর কবিতার নাট্যশীলতা’। ফররুখ আহমদের যে-সব কবিতায় নাটকীয় উপাদান আছে বা দৃশ্যকাব্যের মেজাজে যাদের অন্তরঙ্গ - বহিরঙ্গের চারিত্রিক লক্ষণ অনুভবযোগ্য, কিন্তু মোটাদাগে তাদের দৃশ্যকাব্যের বা কাব্যনাট্যের পর্যায়ভুক্ত করা যায় না; সে সব কবিতার ব্যবচ্ছেদ-ব্যাদান এখানে প্রযুক্ত। ফররুখ কবিমানস বিকাশের প্রথম দিকেই তাঁর কবিতার নাটকীয় বৈশিষ্ট্য কাব্যোমোদীদের দৃষ্টিতে এসেছে। কাব্যত্ব-দৃশ্যত্ব মিলিয়ে ফররুখ তখন নিজেকে চিনিয়ে দিচ্ছেন। দৃঢ়পিনদ্ধ কাহিনির ছাপে, রস ঘনিষ্টতায় কিংবা চিত্তাকর্ষক পরিণতিতে দৃশ্যকাব্যের অদৃশ্য আত্মা দুলতে শুরু করেছে। বিষয়বস্তুর প্রয়োজনে আত্মপ্রকাশের আয়োজনে কবিতাদেহকে নানাভাবে পুনর্গঠন করেছেন। সে ধারা কবির পরিণত পর্যায়েও অব্যাহত থাকে। নিরীক্ষা চলে লঘু-দীর্ঘ কবিতায় কিংবা সনেটে। ব্যবহৃত হয় সংলাপের ভাষা। মুসা আল হাফিজ ‘রাত্রির ঘটনা’ (মুহূর্তের কবিতা),‘আলী হায়দর’ (সিরাজাম মুনীরা),‘বন্দরে সন্ধ্যা’ (সাত সাগরের মাঝি) প্রভৃতি কবিতার অংশ বিশেষ উদ্ধৃত করে উপযুক্ত বক্তব্যের সত্যায়ন প্রতিষ্ঠা করেছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ করেছেন:‘পাঠককে টেনে নেবার একটা সহজাত গুণ, চিত্তচাঞ্চল্যের এক স্বকীয় স্রোত তাঁর বহু কবিতায় নাটকীয় আলোড়ন তুলেছে।’ ‘সাত সাগরের মাঝি’ কবিতার একদিকে যেমন আছে ভয়াল মৃত্যুর নি:শ্বাস, অপর দিকে আশা। কখনো স্বপ্নের কোলাহলে হৃদয় জেগে উঠছে। নারঙ্গী পাতা ঝরে পড়ছে তুমুল ঝড়ে, অপর দিকে হেরার যাত্রীরা শুনছে তারার বিস্ময় কুড়াবার ডাক। তাদের আকাশে মাথা তুলছে হেরার রাজতোরণ। এভাবে চরম বৈপরীত্য,সংকট, শিহরণ ও অভূতপূর্ব চিত্রময়তার ভেতর দিয়ে যে কবিতা সমাপ্তির তীরে তরী ভিড়াচ্ছে, তার মধ্যে প্রাবন্ধিক নাটকীয়তার বিপুল সম্ভাবনা খুঁজে পেয়েছেন। ‘সাত সাগরের মাঝি’ কবিতার চারিত্র-লক্ষণ, রূপ-প্রকৃতি ‘সিন্দাবাদ’‘বার দরিয়ায়’‘আকাশ নাবিক’ও ‘পাঞ্জেরী’ তে সহজেই অনুভবযোগ্য। এসব কবিতা ওয়ার্ডসওয়ার্থ, কোলরিজ , শেলী, কীটস, ইলিয়টী মাধুর্যম-িত প্রকাশভঙ্গির শব্দযোজনা ও রোমাঞ্চ নিয়ে হাজির হয়েছিল বলে প্রাবন্ধিক দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করেছেন। যেখানে নতুন সুর ও আবেগ স্বপ্নরঙ্গিন পথ ধরে বলিষ্ঠ থেকে বলিষ্ঠতর হয়ে নাট্যময় লীলায় মঞ্চায়িত হয়েছে। কবিতাগুলো নিজের অবগুন্ঠন অবমুক্ত করে নাটকীয় ভঙ্গিতে পাঠকের সামনে এভাবে এসে দাঁড়ায়: কেটেছে রঙিন মখমল দিন, নতুন সফর আজ শুনছি আবার নোনা দরিয়ার ডাক ভাসে জোরওয়ার মউজের শিরে সফেদ চাঁদির তাজ পাহাড়-বুলন্দ ঢেউ বয়ে আনে নোনা দরিয়ার ডাক; (সিন্দাবাদ) এভাবে ‘বার দরিয়ায়’ এবং ‘পাঞ্জেরী’ কবিতার কিয়দংশ উল্লেখ করে প্রাবন্ধিক দাবি করেছেন- ‘প্রতীক ও রূপকের এই যে দ্যোতনা, ঐতিহ্য আদর্শের এই যে অবিমিশ্র সংযোগ, বিষয় ও বক্তব্যের চরিত্র অনুসারে ছন্দ ও স্তবক বিন্যাসের এই যে বিচিত্র কৌশল, তারস্বরে কথা বলার এই যে শিল্প, তা শেষ পর্যন্ত নাটকীয়তার আশ্রয়ে হয়েছে আরো প্রাণবন্ত। এই সব কবিতায় নাট্য আঙ্গিক অনুসৃত হয়নি, এগুলোকে দৃশ্যকাব্য বলার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু এগুলোর মধ্যে নাট্যগুণ ও দৃশ্যময়তার যে সঞ্চয়, তা এক কথায় অসাধারণ। ’ (হাফিজ:২০১৬:২১) মুসা আল হাফিজ স্থিতধীচিত্তে লক্ষ্য করেছেন ফররুখের বহু কবিতা নাটক হতে চাইছে: সংলাপের আন্তর্ধর্মে, কাহিনির অন্তর্বয়নে, কবিতার জীবন প্রবাহে পাঠককে সমর্পিত করার কুশলতায়, বর্ণনার রোমাঞ্চধর্মীতায় পাঠক অভিভূত হচ্ছেন,আচ্ছন্ন হচ্ছেন এবং রস-পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। এ বিশেষত্ব ‘ডাহুক’ এবং ‘লাশ’ কবিতায় তো বটেই,উনিশ-বিশ বছরের রচনায় অর্থাৎ কাব্যোন্মোষের প্রাথমিক পর্যায়েই এ প্রভাব-প্রবণতা লক্ষণীয় বলে গ্রন্থকার দাবি করেছেন। বক্তব্যের সমর্থনে আমরা ‘আধারের স্বপ্ন’(১৩৪৫ এর পৌষ সংখ্যায় সওগাতে প্রকাশিত) কবিতার প্রথম স্তবক উল্লেখ করতে পারি- ‘মাধবী বিতানের পাশে তার ছায়া বিতান তবু সে ফুটলো না মধুরাতে বসন্তের বিহ্বলতায় সঙ্গী বসন্ত যেদিন লুটে পড়ল অন্তিম নি:শ্বাসে সেদিন থেকেই বুঝি তার মনে সত্যিকারের অশ্রুর পরাগ জমতে আরম্ভ করেছে। সঙ্গীহীনা ,সে এক কেতকী।’ বলতে দ্বিধা নেই যে ফররুখের পরিণত কবিতার সাথে এ কবিতার ব্যবধান দুস্তর। এটা শীলন কালের সৃষ্টি মাত্র। কিন্তু সেটা কী কবিত্ব বর্জিত? তা মোটেই নয়। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ‘কবিতার ভেতরে আলাপ আছে’। যার বিষয়ে ‘রোমান্টিকতা আভাসিত’। সে কথা বলছে ‘স্পন্দিত গদ্য’ ভঙ্গিতে। কবিতা শুরু হয়েছে চিত্ররচনার মধ্য দিয়ে। পাশাপাশি দেখাচ্ছে দুটি বিতান। হাজির করেছে মধুরাত, স্বপ্নরাঙা বসন্ত, বিহবলতা এবং না ফুটার আক্ষেপ। ‘সে তার মেজাজের কোথায় যেন নাটকীয় স্ফূর্তি নিয়ে প্রকাশমান’। যে ‘স্ফূর্তি কবিতার ভাস্কর্যে নিজেকে প্রত্যক্ষ করে নাটক না হবার অতৃপ্তি ভুলে গেছে’। ফররুখের কবিতাদেহে যে রোমান্টিক মদিরতা, তা উপভোগের ভাষা এ ছাড়া আর কেমন হতে পারে? ‘কাব্যনাটক: খরার শেষে’ অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্রকায় প্রবন্ধ। আকারে ছোট হলেও এর ভা-ে রয়েছে ব্রহ্মা-ের বিশালতা। বিশ্ব সাহিত্যে কাব্য নাটকের উন্মেষ বিকাশ ও পরিণতির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এখানে সংযম-সাঙ্গীকরণে সমর্পিত। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায়: দৃশ্যকাব্য সাধারণত পৌরাণিক, ঐতিহাসিক বা সামাজিক বিষয়কে কেন্দ্র করেই রচিত হয়। খ্রিষ্টপূর্ব গ্রিক ও ইংরেজি সাহিত্যের এলিজাবেথীয় যুগে প্রধানত কাব্যনাটকই রচিত হতো। এটা ছিল কাব্যনাট্যের কাল। পরে যখন গদ্যে নাটক রচনার রীতি আসলো, কাব্যনাট্য হরিয়ে গেলো না। তার পুনর্জন্ম ঘটলো নতুন অনিবার্যতায়। কারণ গদ্যে ধৃত বাস্তবতা ও শিল্প এতোটাই নিরেট ও যান্ত্রিক হয়ে উঠলো, যা মর্মের শিহরণ ও ঘটনার আত্মাকে অনুবাদ করতে ব্যর্থ হচ্ছিলো। নাট্যের গভীরতা ও সত্যের মাধুর্যের প্রয়োজনে কাব্যনাট্যের পুনরুত্থান ঘটলো। ইবসেন ও চেখবের হাত দিয়ে কাব্যনাট্যের সম্ভাবনা নতুন অর্থময়তা লাভ করলো। আইরিশ এ্যাবি থিয়েটার ও জাপানের ‘নো’ নাটক একে দিলো অভিনব বিকাশ। রূপক, সাংকেতিক, জীবনী, হাস্যরসসহ নানা আঙ্গিকে এর প্রস্ফুটন ঘটলো। ভাবের দিক থেকে ক্লাসিক্যাল, নিউক্লাসিক্যাল ও রোমান্টিক-এই তিন ধারায় তার চর্চা পেলো বিস্তৃতি। দৃশ্যকাব্যে সূচিত হলো নতুন বিপ্লব। বিপ্লবের শুরু হয়েছিল ইয়েটসের মতো কবির হাত দিয়ে। তাঁরই মর্ডান ইন দ্য ক্যাথেড্রাল-এর সাফল্যের প্রেরণা ছড়িয়ে পড়ছে দেশে দেশে। বিলেতে ঘটেছে কাব্যনাট্যের পুনরোজ্জীবন। ত্রিশের দশক থেকে ইউরোপের নানা ভাষায় দৃশ্যকাব্যের উত্থানে উন্মুখর থেকেছে বিশ্বসাহিত্য। (হাফিজ:২০১৬:২৯-৩০) বাংলায় মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রামনারায়ণ তর্করতœ, দীনবন্ধু মিত্র, গিরিশচন্দ্র ঘোষ, মনোমোহন বসু, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়,সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মোহিতলাল মজুমদার প্রমুখ কবি সাহিত্যিকবৃন্দ কাব্যনাটক লিখেছেন। যার অধিকাংশ লিখিত হয়েছিল ধর্মীয় ও পৌরাণিক আবহে। ফররুখ আহমদের ‘সাত সাগরের মাঝি’ তে (১৯৪৪) আতীব্র রোমান্টিকতা ও ধ্রুপদী অন্বেষণের এ কাব্যে Ñ নাটকীয়তায় যে প্রতিশ্রুতি উদ্দিপ্ত হলো তা ‘সিরাজাম মুনীরা’য় (১৯৫২) প্রায় সমভাবে ঝংকৃত হয়ে উঠলো। তবে ‘নৌফেল ও হাতেম’ (১৯৬১) কাব্য নাটকে ফররুখের উন্মোচন ঘটেছে এক আশ্চর্য নাট্যশীলতায়। কেননা ত্রিশের কবি বুদ্ধদেব বসু তখনও কাব্যনাট্যে হাত দেননি। পশ্চিম বাংলায় দিলীপ রায়ের কাব্যনাটক ‘দুই আর দুই’ বাম বসুর ‘নীলকণ্ঠ’ ও ‘একলব্য’ কিছুটা ব্যতিক্রম-ব্যত্যয় পরিলক্ষিত হলেও পূর্ববাংলা ছিলো এদিক থেকে স্থবির। অথচ বিশ্বসাহিত্যে তখন কাব্যনাটক এক অসামান্য ঋদ্ধতার পরিসর । বিশ্বসাহিত্যের সমকালীন গতি প্রকৃতির সাথে ফররুখের সংযোগ ছিল বলেই পুঁথিসাহিত্যের সঙ্গে উন্মূক্ত আন্তর্জাতিকতার বাতাবরণে ফররুখ আহমদ বাংলা কাব্যনাট্যের নতুন মাত্রা ও স্বাদ নিয়ে এলেন। এ প্রসঙ্গে লেখক বলেছেন:‘ ইতিহাস ও লোকপুরাণের চরিত্রকে অবলম্বন করে তিনি মানবতার আদর্শিক ডিকশন উপস্থাপন করলেন। বলাবাহুল্য সেই আদর্শ হলো ইসলাম। এর মাধ্যমেই তিনি জাতীয় জীবনের উজ্জীবন ও কল্যাণের অভ্যুত্থানে বিশ্বাসী ছিলেন। যে বিশ্বাস তার রোমান্টিকতাকে দিয়েছে মানবিক অবলম্বন। তিনি তাঁর স্বভাবজাত রোমান্টিকতার সাথে যুক্ত করলেন পুঁথিসাহিত্যের পশ্চাৎভূমি। পুরাণের প্রতীকী নির্যাস নিয়ে লিখেছেন ‘দরিয়ার শেষ রাত্রি’। ‘নৌফেল ও হাতেম’-এ এসে মনোযোগ দিলেন পুরাণের বহিরঙ্গে। আখ্যানমূলক অবয়বে। ধ্রুপদী অন্বেষায় মগ্ন হলেন ‘নয়া জিন্দেগী’ কাব্যনাটকে। এই সব নাট্যপ্রয়াস বৈশিষ্ট্যের নানা খাতে প্রবাহিত হলেও তার কেন্দ্রীয় ধ্রুবা হচ্ছে জীবনের জাগরণ, আত্মার উদ্ভাসন এবং আদর্শের সেই বিভূতি, যা মানুষকে আরো আধিক মানুষ বানায়’। (হাফিজ:২০১৬:৩১) ‘দরিয়ার শেষ রাত্রি: যাত্রা ও প্রত্যাবর্তন’ প্রবন্ধটি বেশ দীর্ঘ। দৃশ্যকাব্য লেখায় কবির সচেতন প্রয়াস এবং প্রকৃত অর্থে নাট্যসংলাপ দেখা যায় ‘দরিয়ার শেষ রাত্রি’ কবিতায়। কবিতায় ঘটনা, চরিত্রের ক্রীড়াশীল ভূমিকায় নাট্যিক আবহ দারুণ উৎকণ্ঠায় আবর্তিত। ভোরের আলো তখন ফুটার অপেক্ষায়। সেই সময়খ-ে শান্ত সাগরবুকে জাহাজের পাটাতনে দৃশ্যটির জন্ম। সাতজন মাঝি-মাল্লার মধ্যে কেউ কেউ সিন্দাবাদকে ঘিরে তাদের ঘরে ফেরার আর্তি পেশ করে উৎকণ্ঠিত সময় পার করছে। পঞ্চম মাল্লা ঘরে ফেরার টান অনুভব করেন ভীষণ আবেগে। তিনি পাটাতনে কান লাগিয়ে শুনেন ‘অনেক দূরে আঞ্জির শাখে’ টাঙনো ‘দোলনার গান’। অধীর আগ্রহে শুনতে পান দুধের বাচ্চার কান্না। প্রত্যাবর্তনের ব্যাকুল আহবান তার তনু-মনে। কিন্তু সিন্দাবাদ জটিলতা সৃষ্টি করেন। তিনি সংসারে ফিরতে রাজি নন। মাঝি-মাল্লারা সিন্দাবাদের সিদ্ধান্তে সুপ্ত প্রতিবাদ জানায়। এভাবে বাদ-প্রতিবাদে তাদের স্বদেশে ফেরার ভূমিজ মমতার জয় হয়। মাল্লারা উচ্চারণ করে চিরায়ত নাড়ির আকুতি। ‘পাতার খিমায়’ বিশ্রাম নেবার আকুতি। ঘাসের শিয়রে বয়ে যাওয়া বাতাসের স্পর্শের আকুতি।‘দরিয়ার শেষ রাত্রি’ কবিতা প্রসঙ্গে প্রাবন্ধিক বলেছেন:‘বর্ণনার বৈদগ্ধ ফররুখের কবিসত্তার অনস্বীকার্য এক দিক। দরিয়া পুরাণের উদ্দাম কবির জন্যে এই বৈদগ্ধ খুবই জরুরি ছিলো। কবিতার স্তরে স্তরে ধ্বনিবহুল শব্দের কারুকার্য, দৃশ্যের পর দৃশ্য এনে চক্ষুষ্মান মিনার নির্মাণ, অভিনব চিত্রের স্পর্শসুখময়তা, মননযুক্ত স্মৃতিময় চিত্রের নিবিড়তা,সমুদ্রের নোনা স্বাদ ও শব্দের মুগ্ধকর তৃপ্তি,অনুভূতিপ্রধান গতিশীল দৃশ্যের আস্বাদ, কিংবা বিষাদময়, বেদনা ও হাহাকার ভরা ধ্বনিরূপ তার কবিতাদেহে অপরূপ অলংকার যোজনা করছে।’ (হাফিজ:২০১৬:৩৭) এভাবে স্মৃতিকাতর চিত্রকল্প চিত্রণে, বাক প্রতিমার প্রগাঢ়তায়, প্রকাশ নৈপুণ্য ও নিসর্গ বর্ণনায় ফররুখ আহমদের সঙ্গে এলিয়ট, অডেনের তুলনীয় একটি রসকল্প প্রাবন্ধিক চমৎকারভাবে নির্মাণ করেছেন। শুধু তাই নয়, ফররুখ আহমদের সিন্দাবাদের সাথে টেনিসনের ইউলিসিস এর চরিত্রগত তুলনীয় দিকটি শুধু সামান্যিকরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। ফররুখ আহমদের সিন্দাবাদ জনান্তরে , দেশান্তরে, কালান্তরে চিত্তজাগরণের প্রতীক বলে তিনি মনে করেন । প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ করেন “ফররুখের সিন্দাবাদ আব্বাসী খেলাফত আমলের সেই কথকতার সিন্দাবাদ নয় । বরং তার ভেতরে সমকালীন আত্মা ভরে দেয়া হয়েছে । নতুন অর্থ ও তাৎপর্যে তার জাগরণ । তার সময়কে সে গ্রাস করেছে আপন ভঙ্গিমায় । সময় তখন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের । মানবতা তখন বারুদ ও মৃত্যুর ব্যথায় লীন । দুর্ভিক্ষের ছোবলে বাংলাদেশ বিপন্ন । উপনিবেশিকতার গাঢ় রাত্রি থেকে মুক্তির অপেক্ষায় গোটা জাতি । স্বাধীনতার স্বপ্নে শিহরিত চরাচর । নতুন রাষ্ট্র জন্ম নেয়ার কাড়া-নাকাড়ায় কম্পমান উপমহাদেশ । নতুন আকাক্সক্ষা পল্লবিত হচ্ছে দিগন্তে । ভোরের স্বপ্নে জাগ্রত মানুষ প্রতীক্ষা করছে ‘ রাত পোহাবার কত দেরি ? ” ( হাফিজ : ২০১৬: ৪২) ছন্দসচেতন কবি মুসা আল হাফিজ মুক্তক মাত্রাবৃত্ত ছন্দের ঐতিহাসিক পরিক্রমা এখানে যুক্ত করেছেন । কেননা দুর্দান্ত শক্তির নিশানবর্দার হয়ে যে মুক্তক মাত্রাবৃত্ত ছন্দের যাত্রা শুরু হয়েছিল, বাংলা কবিতায় সময়ের প্রসারতায় ‘ দরিয়ার শেষ রাত্রি’ তার নৈয়ায়িক প্রকাশ । যদিও ছোট কাব্যনাট্যে এ ছন্দের প্রয়োগ খুবই কম । কিন্তু ফররুখে তা লাভ করলো সামুদ্রিক অভিযাত্রার উচ্ছ্বাস । লাভ করলো অপরূপ কাব্যসিদ্ধির ভেতর দিয়ে । বহু রকম ঘ্রাণ, রঙের পুলক ও দৃশ্যের তোলপাড়ের মধ্য দিয়ে । ইমেজোচ্ছল, উপমাবহুল এবং উৎপ্রেক্ষামুখর ‘ দরিয়ার শেষ রাত্রি’র সফলতা নাট্যগুণে, আবৃত্তিযোগ্যতায় এবং রোমান্টিকতায় প্রদীপ্ত হলো । আরো উজ্জল- উচ্ছল, প্রশস্ত কাব্যনাট্যের প্রতিশ্রুতি যেনো রচনা করলো বলে দাবি করেছেন মুসা আল হাফিজ । ‘নৌফেল ও হাতেম : মানবিক মহিমা ’ এটিও ক্ষুদ্রকায় নিবন্ধ । ফররুখের মানসে ‘নৌফেল ও হাতেম ’ মানবিক মহিম্রা শাশ্বতিক উদযাপন । হাতেমের আধা পৌরাণিক আধা ঐতিহাসিক চরিত্রকে তিনি দাঁড় করালেন সময়ের প্রচ্ছদে । মুসলিম ঐতিহ্য ও ধর্মীয় অনুষঙ্গকে হাজির করলেন জীবনের নতুন পথ নির্মাণের প্রয়োজনে । নৌফেল ও হাতেমকে দিয়ে তৈরী করলেন দ্বন্দ্বের পটভূমি । প্রতীকী এই দ্বন্দ্ব ফিরে আসে নানা পথে । হাতেম এখানে আরো গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক হচ্ছেন স্বদেশের,স্বকালের, স্বসমাজের আবেদনে । ফররুখ মানসে নৌফেল ও হাতেম কেন এই সময়ে প্রাসঙ্গিক, এ বিষয়ে লেখকের ভাষ্য : ‘ইতিহাস ও লোকপুরাণের চরিত্রকে অবলম্বন করে তিনি মানবতার আদর্শিক ডিকশন উপস্থাপন করলেন। বলাবাহুল্য সেই আদর্শ হলো ইসলাম। এর মাধ্যমেই তিনি জাতীয় জীবনের উজ্জীবন ও কল্যাণের অভ্যুত্থানে বিশ্বাসী ছিলেন। যে বিশ্বাস তার রোমান্টিকতাকে দিয়েছে মানবিক অবলম্বন। তিনি তার স্বভাবজাত রোমান্টিকতার সাথে যুক্ত করলেন পুথিঁসাহিত্যের পশ্চাৎভূমি । পুরাণের প্রতীকী নির্যাস নিয়ে লিখেছিলেন ‘দরিয়ার শেষ রাত্রি।’ ‘নৌফেল ও হাতেম’ এ এসে মনোযোগ দিলেন পুরাণের বহিরঙ্গে, আখ্যানমূলক অবয়বে ।’ ফররুখ হাতেমকে নায়ক বানিয়েছেন মুসলিম সংস্কৃতির প্রতিভূ-প্রতীকে । অথচ হাতেম মুসলিম চরিত্র নয়। ইসলামের জীবনীসম্পদে, প্রাণপ্রবাহে তিনি মুসলমানদের অনেক আপন । হাতেমের প্রতিপক্ষ সেই সংস্কৃতির প্রতিভূ, যে মুসলিম সংস্কৃতির প্রতিকূল । উভয়ে জড়িয়ে গেছে সংকটÑসংঘাতে । এই দ্বন্দ্বÑসংঘাতের মধ্য দিয়ে হাতেমের মৌলসত্তা নির্ণিত হযেছে এভাবে : ‘এখানে দ্বন্দ্ব জমছে প্রতীকে রূপকে, ভাবাদর্শের অন্তর্নিহিত পরিক্রমায়। একটি ঘটনা বন্দি থাকছে না ঘটনার পরিসরে। তারা নিজস্ব বৃত্ত অতিক্রম করে অনেক কিছুর প্রতিভূ হয়ে যাচ্ছে। কাহিনী, উদ্দেশ্য চরিত্র ডানা প্রসারিত করছে বিশালতার দিকে। সাদা চরিত্র হয়ে উঠছে উজ্জল থেকে উজ্জলতর। কুৎসিত চরিত্র হচ্ছে আরো বেশি কদাকার। পুরাণের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে কালের সংঘাত। কাহিনী ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে। প্রসারিত হচ্ছে চৈতন্য। জীবনের পাথেয় তালাশ এগিয়ে যাচ্ছে আদর্শবোধের মোহনায়। এরই মধ্য দিয়ে উন্মোচিত হচ্ছে একটি অমোঘ অপরিহার্য প্রাণসত্ত্বা- যার নাম ইনসানিয়াত । (হাফিজ :২০১৬:৪৬) মহোত্তম মানবিক বোধের এ হাতেমকে পুঁথির কবিরা ব্যবহার করেছেন আনন্দের আয়োজনে, পারসিক কবিরা সৃষ্টিসেবার প্রতিভূ হিসেবে, ফররুখ আহমদ তাকে হাজির করেছেন অবক্ষয় কবলিত পুঁজিবাদ শাসিত ‘স্ফীতোদর বর্বর সভ্যতার’ বিপরীতে মানবপ্রেম, নৈতিকতা ও ইনসাফপূর্ণ সভ্যতার প্রতীক হিসেবে বলে প্রাবন্ধিক উল্লেখ করেছেন। ‘কাহিনী : ¯্রােতময় নদী’‘বর্ণিল চরিত্রেরা’ ‘দ্বন্দ্ব ও সমকাল’ এবং ‘প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া’ প্রবন্ধগুলো মূলত ‘নৌফেল ও হাতেম’ কাব্যনাটকের উপজাত সৃষ্টি । ‘প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া ’ ব্যতীত অন্যান্য প্রবন্ধে ‘নৌফেল ও হাতেম’ এর শিল্পসফলতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে ।‘কাহিনী: ¯্রােতোময় নদী’ প্রবন্ধটি বেশ দীর্ঘ । ‘নৌফেল ও হাতেম’ কাব্যনাট্যের কাহিনীর সাবলিল গতিবর্ণনা এখানে ¯ফূর্তি লাভ করেছে । নৌফেলের রাজ্যে প্রাচীন এক মেলার কিছু খ-দৃশ্য দিয়ে কাহিনীর সূত্রপাত । হাতেমের মহত্বের কাছে মানবতার মুখোশপরা আত্মদ্বন্দ্বে পরাভূত নৌফেলের ক্ষমা চাওয়ার ছবি দিয়ে কাহিনীর সমাপ্তি । কাহিনি বর্ণনায় লেখক এমন এক প্রকাশরীতির আশ্রয় নিয়েছেন, যাতে করে পাঠক সমগ্র কাব্যের প্লট বিন্যাসের প্রতিটি ভাঁজে ছড়িয়ে থাকা জীবনের মহত্ব ও আত্মপ্রতারণার অন্বিষ্টের ধারণা পেয়ে যান শৈল্পিক সজ্জায় । ‘বর্ণিল চরিত্রেরা’ প্রবন্ধে কাব্যনাটকের চরিত্রগুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণ স্থান পেয়েছে । চরিত্রগুলোর বাহ্যিক বৈশিষ্টের পাশাপাশি অন্তরপ্রদেশের তীব্র পীড়ন, ভাঙ্গন, ক্ষরণ ইত্যাদিও চমৎকার কাব্যিকতায় উপস্থাপিত হয়েছে । চরিত্রগুলোর মধ্যে সর্বাধিক জীবন্ত চরিত্র নৌফেল । নৌফেল চরিত্রটি বিবর্তনের মধ্য দিয়ে পরিণতি পেয়েছে । হিংসা, যশোলিপ্সার ভয়ানক খেলায় সে নিজেই নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী এবং অত্যন্ত অসহায়ভাবে নিজের কাছে পরাজিত । জটিল মনস্তাত্ত্বিক ঘূর্ণাবর্তে সে আন্দোলিত । আত্মার নিভৃত বলয়ে লুকিয়ে থাকা অশুভ অভিপ্রায়সমূহ তাকে সমাজ, পরিবেশ ও শান্তি স্বাভাবিকতার বিরুদ্ধ শক্তি হিসেবে তৈরি করে । হঠাৎ নয়, ঘটনা পরম্পরায় তার এ মানসিকতার এক সময় বদল হয় । এভাবে তার মধ্যে দোষে-গুণে রক্ত-মাংসের মানুষের স্বভাব স্বকীয়তায় ফুটে উঠেছে । অন্যদিকে হাতেম চরিত্রটি সর্বত্রই কল্যাণ- শুভ শক্তির আধার। ¯েœহ প্রেম ভালবাসার করুণায় বিগলিত এক কামিল ইনসানিয়াত। মাত্র চারটি দৃশ্যে তার সাক্ষ্য পাওয়া যায়। হাতেম মহত্বে-মানবপ্রেমে লীন হলেও তার মধ্যে মনুষ্য স্বভাব অনুপস্থিত বলে কেউ কেউ দাবি করেন। আসলে কামিল ইনসান চরিত্রের স্বভাব এমনইÑঅতিমানবীয়তার স্বপ্ন বাসরে তাদের রসময় স্থিতি বলে প্রবন্ধকার মনে করেন। অন্যান্য অপ্রধান চরিত্রের মধ্যে মুসাফির, গুপ্তচর, খাজাঞ্চি, কাঠুরিয়া, মুটিয়া বেগম, মুর্শিদ প্রমুখ। ফররুখ আহমদ এসব অপ্রধান চরিত্র-চিত্রণে বেশি সফল বলে প্রবন্ধকার প্রাসঙ্গিকভাবে তুলে ধরেছেন। ‘দ্বন্দ্ব ও সমকাল’ প্রবন্ধটি মূলত ‘নৌফেল ও হাতেম’ কাব্য নাটকের অন্তনির্হিত তাৎপর্য ঘিরে আবর্তিত। এখানে চরিত্রগুলোর দ্বন্দ্ব গদ্যের মতো সরাসরি নয়। যেহেতু এটা কাব্য নাটক এবং কাব্য নাটকে ঘটনা সব সময় মুখ্য নয়। তাই দ্বন্দ্ব ঘটনা হয়ে আসছে না। আসছে ঘটনার আত্মায় বিদ্যমান ভাবাদর্শের বিরোধে, রূপকের মাধ্যমে, প্রতীকের মাধ্যমে। এখানে দ্বন্দ্ব তৈরি করছে ভাব-মর্যাদার সঙ্গে প্রতিমূর্তি, দিনের সঙ্গে রাত, একের সঙ্গে বহু। একটি চরিত্রের শুভ্রতার বিপরিতে আরেকটি চরিত্রের কদর্যতা এই দ্বন্দ্বের কেন্দ্রীয় বিষয়। ফররুখ আহমদ কিংবদন্তীর শরীরে নাটককে সাজিয়েছেন। এমন নাটকে দ্বন্দ্ব মূলত প্রতীকীই হয়ে থাকে, সরাসরি নয়। ইশারায়, পদচ্ছাপে তৈরি হয় তার ধারা। মুসা আল হাফিজ নাটকের এই চারিত্রিক দ্বন্দ্বকে এভাবে উদ্বৃত করেছেন: ‘ নৌফেলের চোখে ভাসে নিস্প্রাণ অজানা ভূগোল। আর হাতেম দেখে প্রাচুর্যের সজীব পৃথিবী। এর মধ্যে ফুটে উঠে দ্ব¦ন্দ্ব। প্রতিফলিত হয় ব্যক্তি চরিত্র। স্পষ্ট হয় তাদের জীবনবোধের ভিন্নতা। এই ভিন্নতা সাদা-কালোর বলিষ্ট রেখায় জাগ্রত।’অবশ্য সুনীলকুমার মুখোপাধ্যায় মনে করেন- ফররুখ আহমদ আপনার মনোগত আদর্শকে উজ্জলরূপে তুলে ধরতে চেয়েছেন বলে জীবনের দ্বান্দ্বিক রূপকে কাজে লাগাতে পারেন নি। (মুখোপাধ্যায় : ১৯৬৯:৭৪) সমকাল প্রসঙ্গে বলা যায়, কবি ফররুখ আহমদ পুরাণের গায়ে সময়কে চড়িয়েছেন অত্যন্ত সচেতনভাবে। নাটকটি ১৯৬১ সালে প্রকাশিত হয়। নৌফেলের প্রতীকে আইয়ুবী স্বৈরশাসনের অনিবার্য পরিণতি এখানে দানা বেঁধে উঠেছে। কাব্য থেকেই তার প্রমাণ দেয়া যায়। উত্তেজিত তৃতীয় খাদেম জানায়- “সেদিন নামাবে টেনে অত্যাচারী নৌফেল বাদশাকে ধূলিতে বা জাহান্নামে; রক্ত নিয়ে কিংবা রক্ত দিয়ে” অত্যাচারী শাসকের কাছে জনতার শেষ আকুতি মুর্শিদের কণ্ঠে শোনা যাচ্ছে, নিপীড়িত জনতার কণ্ঠস্বরের প্রতীকে: “ধ্বংস,হয়ে যাক দেশ, ধ্বংস হোক সকল সংসার চাই না তবু কোন দুশমনের ঘৃণ্য সমর্থক; চাই না বিষাক্ত সাপ দেখে যেতে গোপন-আস্তিনে” নিপীড়িত-বঞ্চিত জনতার মধ্যে জীবন-যন্ত্রণার যে হাহাকার, তা আইয়ুবী দু:শাসনের প্রতিভূ-প্রতীকে ‘নৌফেল ও হাতেম’-এ স্ফূর্তি লাভ করেছে। এ প্রসঙ্গে লেখক বলেছেন:‘তাহলে দেখা যাচ্ছে প্রাচীন কাহিনীর ভেতর সকলের জীবন ও যন্ত্রণাকে পুঁতে দিয়েছেন ফররুখ। আরব পুরাণকে জীবিত করেছেন চিরকালীন সমস্যার প্রেক্ষাপটে। এ থেকে উপস্থাপন করেছেন জাতির জন্যে নির্দেশনা। যেমনটি করেছেন টেনিসন। গ্রীক জীবনের প্রাচীন নায়ক ইউলিসিসকে ভিক্টোরিয় ইংল্যান্ডের সমকালীন প্রতিনিধি হিসেবে তিনি উপস্থাপন করেন। তার কাহিনীতে ছড়িয়ে ভিক্টোরিয়ানদের দু:খ Ñ দুর্দশা, আশা ও প্রত্যয় । ফররুখ আহমদ প্রভূত সূক্ষ¥তা এবং কিছুটা গৌণতাসহ ষাটের দশকের দেশ-জাতি শুধু নয় বরং বর্তমান দুনিয়ার নিপীড়িত মানুষের সংকট ও আদর্শিক সমাধান ব্যাখ্যা করেছেন নৌফেল ও হাতেম নাটকে।’ (হাফিজ:২০১৬:৮০) এ কাব্যনাটকের সংলাপ ও ছন্দ প্রকরণ- চেতনা বিশ্লেষণে লেখকের অধ্যয়নের গভীরতা সহজে চোখে পড়ে। ‘প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া’ প্রবন্ধটিও ‘নৌফেল ও হাতেম’ কে কেন্দ্র করে রচিত। নাটকটি ঢাকা বেতার কেন্দ্রে প্রচারিত হয় ১৯৫৮ সালে। ১৯৬০ সালে বাংলা একাডেমি উদযাপিত নাট্যসপ্তাহে মঞ্চস্থ হয়। গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ১৯৬১ সালে জুন মাসে। প্রকাশের পর থেকে গ্রন্থটির অনেকগুলো সংস্করণ বের হয়েছে। বুঝতে অসুবিধা নেই যে এর পাঠকপ্রিয়তা কতটুকু ছিল। ঢাকা বেতারে প্রচারিত ও প্রযোজিত হবার পর তিনি লাভ করেন প্রেসিডেন্ট পুরস্কার ‘প্রাইড অব পারফরমেন্স’। গ্রন্থটির রিভিও লেখেন অনেক প্রখ্যাত কবি-সমালোচক-সাহিত্যবোদ্ধা : আবদুল কাদির,অধ্যাপক আবদুল হাফিজ,ড.সিরাজুল ইসলাম প্রমুখ । বক্ষমাণ প্রবন্ধের উল্লেখযোগ্য দিক হল ‘নৌফেল ও হাতেম’ প্রকাশের পর ফররুখের শৈলী ও ভাষাগত নিরীক্ষার প্রভাব আমাদের উপর কীভাবে পড়তে থাকে সেটা নৈষ্ঠিক প্রয়াসে সম্পন্ন করা। পুঁথি-পুরাণকে অবলম্বন করে নবরূপে রচিত হতে থাকে বহু কাব্য-দৃশ্যকাব্য। মুসলিম পরিবেশ সৃষ্টি ও ঐতিহ্যের নবরূপায়ণে পুঁথির ঘটনা ও চরিত্র নতুনভাবে রচনা করেন অনেকেই। মুফাখখারুল ইসলাম,সৈয়দ আলী আশরাফ,আশরাফ সিদ্দিকী, মতিউল ইসলাম,মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ,শাহেদা খানম,আবদুর রশিদ ওয়াসেকপুরী,আবদুর রশিদ খান,আলাউদ্দিন আল আজাদ,আহসান হাবীব,সৈয়দ শামসুল হক,আফজাল চৌধুরী প্রমুখ সে নামের দীর্ঘমিছিলের প্রতিনিধিত্বকারী কয়েকজন। প্রবন্ধটি প্রণয়নে গ্রন্থকারের রসবোধ ও অনুসন্ধিৎসু মানসিকতা কৌতূহলী পাঠককে সুখদ আনন্দ দান করে। ফররুখের তৃতীয় কাব্যনাটক ‘নয়া জিন্দেগী’ যা পরে ‘ইবলিস ও বনি আদম’ নামে রূপান্তরিত হয়।‘নয়া জিন্দেগী’ মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকার ১৩৫৯ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। উক্ত কাব্যনাটক বিশ্লেষিত হয়েছে ‘ইবলিস ও বনি আদম: ধ্রুপদ উপসংহার’ শিরোনামের প্রবন্ধে। ফররুখের যে মহিম কাব্যযাত্রা শুরু হয়েছিল উত্তাল রোমান্টিকতায়, এখানে তা আশ্চর্য এক ধ্রুপদ বিকাশে শিহরিত। অন্তর্মূল্যে এ বিকাশ প্রগাঢ় সম্পন্নতায় প্রবুদ্ধ;এখানে রহস্য থেকে উত্তরণের দিকে তার যাত্রা বলে প্রবন্ধকার মনে করেন। ইবলিস ও বনি আদমÑ স্বভাবের অন্তর্মূলে উভয়ের দ্বন্দ¦। দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে সত্যের উন্মোচন। সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে কবি মানসের প্রস্ফুটন। একদিকে আধিপত্যবাদী পাশব-পাপাত্মা অন্যদিকে প্রথম মানব ও তার বংশধর। তার ধ্রুপদ মেজাজে এ সংঘাতের বুনিয়াদ ছিল প্রোথিত। মুসা আল হাফিজের স্থিতধী চিত্তে এ নাটকের মূল্যায়ন স্ফূতির্ লাভ করেছে এভাবে: ‘ইবলিস ও বনি আদমে ফররুখ আহমদ নিজের কামনাকে দিয়েছেন আরো স্পষ্টতা। আরো বেশি আদর্শিক বিক্রম। অনেকটা খোলামেলা হয়েছে ভাষ্য। বর্ণনা হয়েছে বক্তব্য প্রধান। বেড়েছে প্রচারকামী বাকবিস্তার। কিন্তু আশ্চর্য এক সংরাগ, সংবেদ ও সংগঠন কবিতাকে দিয়েছে জীবনীশক্তি। চরিত্রের প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছেন। অন্তর্নিহিত সারল্যকে দিয়েছেন আবেগময় গতি। ফলে মেকিত্ব কোথাও ধরা দেয়নি। বহি:চরিত্রের উঠা-নামায়, কাহিনীর ডালপালা বিস্তার ও ঘটনার চিত্রায়ণে কবিত্ব লঘু হয়নি। কবিতায় যে হৃদয়দৃষ্টি থাকে , তা এখানে জাগ্রত থেকেছে এবং বাহ্যিক দৃষ্টির চাইতে তার পরিধি হয়েছে বহুব্যাপ্ত। মর্দে মুমিনের যে অবয়ব নৌফেল ও হাতেমে জীবন্ত হয়েছে,আত্মার সেই বিভূতি উপচে পড়েছে ইবলিস ও বনি আদমের সংলাপে,এখন সে আদর্শ আর ব্যক্তিক নয়,হয়ে গেছে গোটা বনি আদমের কামনা।’ (হাফিজ:২০১৬:৯৯) ইবলিস ও বনি আদমে যে কাহিনি ও কিংবদন্তির চিত্রায়ণ হয়েছে, তা কুরআন,বাইবেল ও অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ থেকে গৃহীত নির্যাস-সত্য।ফররুখ আহমদ এখানে জীবন যন্ত্রণাকে উপস্থিত করে বর্তমানকে উচ্চকিত করেছেন। পুঁজির নিপীড়ন ও অত্যাচারীদের উৎপীড়নের বিরুদ্ধে তৃতীয়বিশ্বের শপথ ও জাগরণের বাণী এ নাটকে নিনাদিত বলে প্রাবন্ধিক মনে করেন। গ্রন্থটির পরিশিষ্ট নির্মিতি পেয়েছে ফররুখ আহমদের জীবন ও সাহিত্যকর্মের তথ্যনিষ্ঠ বাণী ভঙ্গিমার সাবলীল বয়ানের মাধ্যমে। সংস্কৃত আলঙ্কারিকগণ নাট্যসাহিত্যকে কাব্য নামে অভিহিত করেছেন। তাঁরা কাব্যকে দৃশ্য ও শ্রব্য কাব্য নামে পরিচিতি দেন। নাটক দৃশ্যকাব্যের অন্তর্গত। মুসা আল হাফিজ ফররুখ আহমদের যে সব কবিতার মধ্যে নাট্যশীলতার সদার্থক উপস্থিতি প্রত্যক্ষ করেছেন, সেগুলো থেকে কিছু নির্বাচন করে এবং অন্য কয়েকটি কাব্য নাটকের আলোচনা এ গ্রন্থের সীমায় একীভূত করেছেন বলে গ্রন্থনাম যথার্থ। পরিশেষে বলব কাব্য-নাটক বা সাহিত্যের যে কোন কর্মের বিশ্লেষণে সমালোচনার একটি নিজস্ব পরিসর আছে, বোধ আছে,ভাষা আছে। মুসা আল হাফিজ ‘দৃশ্যকাব্যে ফররুখ আহমদ’ প্রণয়নের মাধ্যমে আমাদের জন্য সে সীমানায় প্রবেশের মাহেন্দ্রক্ষণ তৈরি করলেন। লেখকঃড.মো.রিজাউল ইসলাম `আহমদ শরীফ সাহিত্যসাধনা ও জীবনদর্শন’ ছিলো তাঁর ডক্টরেট থিসিস। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের শ্রেষ্ঠ গবেষকের পুরস্কার তিনি অর্জন করেন ২০০৭ সালে । বর্তমানে অধ্যাপনা করছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সিলেটে, বাংলা বিভাগে । তাঁর লিখিত গ্রন্থের মধ্যে আছে ‘শাহেদ আলীর কথাসাহিত্যে সমাজবাস্তবতার শিল্পরুপ (২০১৪) রবীন্দ্র-নজরুল সাহিত্য এবং (২০১৬)

মাত্র ৪০ টাকায়

২-৫ দিনের মধ্যে ডেলিভারি দেয়া হয়
 

ক্যাশ অন ডেলিভারি

শুধু মাত্র ঢাকা ও এর আশেপাশে প্রযোজ্য
 

০১৭২১ ৯৯৯ ১১২

ফোনের মাধ্যমে ও অর্ডার নেয়া হয়