এখানে ভূত তাড়ানো হয় ফোন করে আসবেন
অলক্ষুণে সূচনার অনেক পরে...
চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার‚ ঝিঁঝি পোকার ডাক ভেসে আসছে খুব কাছে থেকে। আগরবাতির গন্ধও পাওয়া যাচ্ছে। জায়গাটা ঠিক কোথায় তা বোঝা যাচ্ছে না। কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর আগরবাতির গন্ধটা মিলিয়ে গিয়ে একটা গুমোট ভ্যাপসা গন্ধ নাকে লাগছে। আরও একটু অগ্রসর হতেই
চোখে পড়ল ঝোপের ভেতর অসংখ্য জোনাকি পোকা। এ যেন এক স্বর্গীয় মুহূর্ত! জ্বলজ্বল করতে থাকা জোনাকি পোকাগুলোর মধ্যে হঠাৎ যেন হুটোপুটি শুরু হয়ে গেল। দল বেঁধে উড়ে যাচ্ছে পাশের আরেকটা ঝোপের দিকে‚ কী আছে ওখানে?
পা দুটো এগিয়ে গেল ওই ঝোপটার দিকে। কাছাকাছি যেতেই একটা অপরিচিত গন্ধ নাকে এসে লাগল। কীসের গন্ধ এটা?
প্রথমে ঠাহর করা না গেলেও পরে অবশ্য বুঝতে পারল‚ গন্ধটা ঝোপের ভেতরে ফুটে থাকা গুটিকতক বুনোফুলের ঘ্রাণ। ঝোপটার পাশ ঘেষে দাঁড়াতেই বুনোফুলের ঘ্রাণ আরও তীব্র হলো।
জোনাকি পোকাগুলো হঠাৎ একে অপরের সাথে জুড়ে গিয়ে লন্ঠনের মতো আকার নিলো। এর ফলে আলোর প্রখরতা বেড়ে গেল কয়েকগুন। জোনাকি পোকাগুলো লন্ঠনের আকার নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছে একটু দূরের আরেকটা ঝোপের ভেতর দিকে। জঙ্গল ওদিকটায় আরও বেশি ঘন।
পা দুটোর মালিক কৌতূহলের ইন্ধনে এগিয়ে যেতে থাকল জোনাকিগুলোকে অনুসরণ করে। বুনোফুলের ঘ্রাণ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে এখন। কিছুক্ষণ পরই একটা চাপা আর্তনাদ শোনা গেল।
নগ্ন পা দুটোর একটাতে বুনো গাছের কাঁটা ফুটেছে। ক্ষতস্থান থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। তবে অন্ধকারে সেটা বোঝা যাচ্ছে না।
পা দুটোর মালিক এখন খুঁড়িয়ে হাঁটছে। লন্ঠনের আকারধারী জোনাকিগুলো এখন একটা ঝোপের আড়ালে গিয়ে থমকে গেছে। পা দুটোও জোনাকিগুলোকে অনুসরণ করে পৌঁছাল সেই ঝোপের সামনে।
কই? কিছু নেই তো!
পা দুটোর মালিক এবার এদিক-ওদিক তাকাল। হঠাৎ খেয়াল করল‚ বুনোফুলের ঘ্রাণটা আরও তীব্রভাবে নাকে আসছে। ফুলগুলো কি তাহলে এই ঝোপেই ফুটেছে? কিন্তু কই? ফুল তো দেখা যাচ্ছে না।
লন্ঠনের আকারধারী জোনাকিগুলা এবার ঝোপের ভেতর দিকে ঢুকে গিয়ে মাটির দিকে নামতে শুরু করেছে। পা দুটোর মালিক ঝোপের ভেতর ঢুকে‚ নিচের দিকে তাকাল।
একি! কী এটা? ভয় মিশ্রিত চাপা আর্তনাদে ছেয়ে গেল চারিদিক।
বুনোফুলের ঘ্রাণ আরও একবার তীব্রভাবে নাকে এলো‚ এরপর যেন মিলিয়ে গেল। বুনোফুলের ঘ্রাণ মিলিয়ে যেতেই ভেসে এলো মাংস পচার বিকট দুর্গন্ধ। গন্ধটা এতই বাজে যে‚ খালি পেটে থাকা সত্ত্বেও পা দুটোর মালিক বমি করে ফেলল। খালি পেটে থাকার জন্য‚ তার মুখ থেকে বের হতে
লাগল সবুজরঙা পিত।
তিতা পিতের বিশ্রী স্বাদে গা গুলিয়ে উঠল আরও তীব্রভাবে।
জোনাকিগুলো এখনও লন্ঠনের আকার ধারণ করেই আছে, ওদের মধ্যে কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি।
পা দুটোর মালিক এবার কিছুটা ধাতস্থ হলো, পচা গন্ধটাও নাকে সয়ে এসেছে অনেকটা।
সে নাকে হাত দিয়ে এগিয়ে গেল জোনাকিগুলোর দিকে।
আরও একবার চাপা আর্তনাদ শোনা গেল।
একটা মেয়ের অর্ধগলিত লাশ!
কে মেয়েটা? কে মারলো একে? লাশটা খানিকটা নড়ে কি? তাই তো মনে হলো।
অর্ধগলিত লাশটা এবার আস্তে-আস্তে উঠে বসল।
পা দুটোর মালিক এই আকস্মিক ঘটনায় ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠল, তার চিৎকার অবশ্য কেউ শুনল না। দৌড়ে পালিয়ে আসতে চাইল, কিন্তু পারল না। পা দুটো তাদের মালিকের কথা শুনতে নারাজ। হাঁটার চেষ্টা করলেই ক্ষত জায়গাটা টনটনিয়ে উঠে গড়িয়ে পড়ছে গরম রক্ত। তারপরও পা
দুটোর মালিক ব্যথা অগ্রাহ্য করে ছুটতে চেষ্টা করে মাটিতে হুড়মুড়িয়ে পড়ে যাচ্ছে। পালানোর চেষ্টা বারবার ব্যহত হওয়ায় পা দুটোর মালিক এবার হাল ছেড়ে দিয়ে মাটিতে বসে পড়ল। ঠিক তখনি খেয়াল করল জোনাকিগুলো ওর পিছু নিয়েছে। সে থেমে যাওয়ায় জোনাকিগুলোও থমকে গিয়ে
আবারও লন্ঠনের আকার ধারণ করল।
বুনোফুলের ঘ্রাণ আবারও ফিরে এসেছে। এবার আরও তীব্র। এখন আরও জোরালোভাবে ঘ্রাণ পাওয়া যাচ্ছে। বুনোফলের ঘ্রাণে চোখ জুড়িয়ে ঘুম আসছে যেন, কিন্তু ঘুমানো যাবে না। ঘুমালেই মৃত্যু নিশ্চিত। ওকে পালাতে হবে, পালাতেই হবে।
পা দুটোর মালিক এবার উঠে দাঁড়িয়ে, খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে যত দ্রুত সম্ভব হাঁটতে শুরু করল। জোনাকিগুলো লন্ঠনের আকার ছেড়ে আবারও ওর পিছু নিলো। বুনোফুলের ঘ্রাণও পিছু ছাড়ল না, পুরোদমে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে গেল।
হঠাৎ করে বুনোফুলের ঘ্রাণ যেন ওকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। ঘ্রাণটা এত প্রখর হয়ে উঠেছে যে মনে হচ্ছে, নিঃশ্বাসের সাথে গন্ধটা একেবারে শরীরের মধ্যে প্রবেশ করে যাচ্ছে।
পা দুটোর মালিক খেয়াল করল, জোনাকিগুলো আর ওর পিছু নিচ্ছে না। জোনাকিগুলো না থাকায় চারিদিকের অন্ধকার গাঢ় হয়ে উঠল। ভয়ে-ভয়ে এগোতে থাকল সে, কিন্তু দু-এক পা এগিয়েই থামতে বাধ্য হলো। ওর সামনে একটা অবয়ব দাঁড়িয়ে।
অবয়বটির সারা শরীরে জ্বলতে থাকা মৃদু নিয়ন আলোগুলোর কারণেই এই নিকষ কালো অন্ধকারেও সে দৃশ্যমান। পা দুটোর মালিক এবার ভয়ে থরথর করে কাঁপতে শুরু করল। এ কোন নতুন বিপদ!
অবয়বটি এবার ফিরে তাকাল পা দুটোর মালিকের দিকে। সে লক্ষ করল অবয়বটির শরীরে একটা আলখাল্লার মতো পোশাক, তাতে বিভিন্ন আঁকিবুঁকির মধ্যে ফুটে আছে অসংখ্য ছোট-বড়-মাঝারি সাইজের বুনোফুল। ফুলগুলোর রং হলুদ, ওগুলো থেকে মৃদু হলুদাভ আলো ঠিকরে পড়ছে।
তার সাথে ভেসে আসছে বুনোফুলের সেই মিষ্টি ঘ্রাণ।
বুনোফুলের আলোয় অবয়বটির চেহারা দৃশ্যমান হলো। লোকটি বৃদ্ধ, ভ্রু-যুগল থেকে শুরু করে কাঁধ পর্যন্ত ঝুলতে থাকা চুল, দাড়ি, গোঁফসহ চোখের পাপড়িগুলো পর্যন্ত ধবধবে সাদা। গলায় কিছু অবোধ্য হরফের আঁকিবুঁকি।
- নাম : এখানে ভূত তাড়ানো হয় ফোন করে আসবেন
- লেখক: নাবিহা নুপুর
- প্রকাশনী: : সতীর্থ প্রকাশনা
- পৃষ্ঠা সংখ্যা : 184
- ভাষা : bangla
- বান্ডিং : hard cover
- প্রথম প্রকাশ: 2025





