সকল বই সেরা বিসয়্সমুহ জনপ্রিয় লেখক প্রকাশনী লগইন

আবুল হোসেন ভট্টাচার্য

আমি কেন ইসলাম গ্রহণ করলাম

আবুল হোসেন ভট্টাচার্য
 ১৭০.০০

আমি কেন খৃস্টধর্মগ্রহণ করলাম না

আবুল হোসেন ভট্টাচার্য
 ১২৮.০০

মূর্তিপূজার গোড়ার কথা

আবুল হোসেন ভট্টাচার্য
 ১২৮.০০

ইতিহাস কথা কয়

আবুল হোসেন ভট্টাচার্য
 ১৭০.০০

শেষনিবেদন

আবুল হোসেন ভট্টাচার্য
 ১২৮.০০

দীন ধর্ম রিলিজিয়ন

আবুল হোসেন ভট্টাচার্য
 ৬৮.০০

আর্তনাদের অন্তরালে

আবুল হোসেন ভট্টাচার্য
 ৬৪.০০

লেখক পরিচিতি

জাতীয় অধ্যাপক মরহুম সৈয়দ আলী আহসান বলেছেন, পরিপূর্ণ বিশ্বাস ছাড়া কোনো মানুষ প্রকৃত মানুষ হতে পারে না। বিশ্বাস নিয়েই মানুষ বেঁচে থাকে। খাঁটি, অকৃত্রিম, একনিষ্ঠ ঈমান বা বিশ্বাস ব্যতিরেকে মানুষের মনুষ্যত্ববোধ জাগ্রত হয় না। মানুষকে টিকে থাকা এবং ব্যক্তিত্বকে বিকশিত করার প্রধান অবলম্বন ঈমান। পারস্পরিক বিশ্বাস, শ্রদ্ধাবোধ এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের মাধ্যমে আদর্শ পরিবার ও সমাজ গড়ে ওঠে। ব্যক্তিগত বিশ্বাস সুদৃঢ় না হলে কাক্সিক্ষত সফলতা অর্জন অসম্ভব। আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস মানুষকে মহিমান্বিত করে, চূড়ান্ত সফলতা দান করে। সকল মানুষ একই বিশ্বাস, একই দ্বীন, এক আল্লাহর বান্দা হিসেবেই দুনিয়ায় জন্ম নেয়। জীবন পরিক্রমায় অভিভাবক, পরিবার, আত্মীয় স্বজন, শিক্ষাব্যবস্থা তাকে বিভিন্ন মতাদর্শে বিভক্ত করে ফেলে। কিন্তু জীবনের কোনো সময় সে উপলব্ধি করে, আল্লাহর পথে প্রত্যাবর্তনের মধ্যেই জীবনের সুখ-শান্তি নিহিত। এই চিন্তা চেতনা থেকেই পৃথিবীর লাখ লাখ মানুষ ইসলামের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। নতি স্বীকার করেছে আল কুরআনের কাছে। ইসলামের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে ইংল্যান্ডের পপ তারকা ক্যাট স্টিভেনসন হলেন ইউসুফ ইসলাম, বিশ্বখ্যাত মুষ্টিযোদ্ধা যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাসিয়াস ক্লে হলেন মোহাম্মদ আলী, অস্ট্রিয়ার কূটনীতিক লিওপোল্ড উইস হলেন মোহাম্মদ আসাদ, ভারতীয় ভগবান ড. শিবশক্তি স্বরূপজী হলেন ইসলামুল হক, মার্কিন ব্যবসায়ী ও পাইলট রিচার্ড প্যাটারসন হলেন আব্দুল আজিজ, দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটার ওয়েইন ডমিনিক পারনেল হলেন ওয়েইন ওয়ালিদ পারনেল, ভারতীয় কবি কমলা দাস হলেন কমলা সুরাইয়া, পাকিস্তানের ক্রিকেটার ইউসুফ ইউহান হলেন মোহাম্মদ ইউসুফ, বৃটিশ পার্লামেন্টারিয়ান লর্ড হেডলি হলেন আল ফারুক। এমনিভাবে মহানবীর আদর্শকে বেছে নিয়েছেন ব্রিটিশ সাংবাদিক রেডলি, এমটিভি’র উপস্থাপক ক্রিস্টিনা ব্রেকার, মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ নেতা লুই ফারাহ খান, ভারতীয় বংশোদ্ভূত নাসার নভোচারী বিজ্ঞানী সুনীতি পা-ে, আসামের কংগ্রেস এমপি রুমি নাথ, মার্কিন নাগরিক সান স্টোন, ফিলিপাইনি অভিনেত্রী কুইনি ম্যাডিলা, হলিউড অভিনেত্রী প্যারিস হিলটন।

মরহুম আবুল হোসেন ভট্টাচার্য এমনই একজন মানুষ। পারিবারিক ও পিতৃপ্রদত্ত নাম সুদর্শন ভট্টাচার্য। জন্ম শরীয়তপুর উপজেলার দাসের জঙ্গল গ্রামে ১৯১৬ সালে এক পুরোহিত ব্রাহ্মণ পরিবারে। পিতার নাম শশীকান্ত ভট্টাচার্য এবং মাতার নাম রাঙা বউ। বাল্যজীবন কেটেছে শরীয়তপুর, ছাত্রজীবন কেটেছে কলকাতায়। গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি নিয়েছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ১৯৩৭ সালে তিনি ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেন। ১৯৪৬ সালে মালদহ জেলায় মহকুমা প্রচার কর্মচারী হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন। ১৯৪৭ সালের আযাদীর পর তিনি রাজশাহীতে চলে আসেন। ১৯৪৭ সালে তিনি সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেন। সর্বশেষ তিনি বাংলাদেশ কৃষিতথ্য সংস্থার গণসংযোগ বিভাগে কর্মরত ছিলেন।

তখন এদেশ উপনিবেশবাদী গোষ্ঠীর দখলে। ফিরিঙ্গিদের কবলে বাংলা পাক ভারত উপমহাদেশের মানুষ। মজলুম মানবতার আর্তনাদে কম্পমান এদেশের আকাশ বাতাস। মুসলমানদের অবস্থা তখন খুবই শোচনীয়। কলকতাকেন্দ্রিক বর্ণহিন্দু বুদ্ধিজীবীরা ছিলো বৃটিশদের প্রধান সহযোগী। মুসলমানরা তাদের কাছে ছিলো লাইভ স্টক (গৃহপালিত পশু)। মুসলমানদেরকে তারা মানুষ ভাবত না। বর্ণহিন্দুদের লেখায় মুসলমানমাত্রই যবন, ম্লেচ্ছ, দানব, রাক্ষস, ইতর, অভদ্র। কংগ্রেস ও মহাসভা নেতা শ্যামা প্রসাদ মুখোপাধ্যায় মুসলমানদের জন্তু জানোয়ার বলতেও দ্বিধা করেননি। তিনি ১৯৪৩ সনে ডেমরার রূপগঞ্জের মুড়াপাড়ায় বলেন, ‘মুসলমান ইনসান হৌ তো জানোয়ার কৌন হো’ অর্থাৎ মুসলমানরা যদি মানুষ হয় তাহলে জন্তু জানোয়ার কারা?’। (আত্মঘাতী রাজনীতির তিনকাল প্রথম খ--সরকার শাহাবুদ্দিন আহমদ, বুকস ফেয়ার, প্রকাশ ২০০৪, পৃষ্ঠা- ২৬৩)।

মুসলিম মিল্লাতের সেই কঠিন দুঃসময়ে ইসলামের মধ্যে প্রবেশ ছিলো ভয়ঙ্কর দুঃসাহসের ব্যাপার। এই দুঃসাহসী পদক্ষেপই গ্রহণ করলেন সুদর্শন ভট্টাচার্য। খৃস্টধর্ম গ্রহণ করতে গিয়েও সেখান থেকে ফিরে আসেন। বেদ, গীতা, মহাভারত, রামায়ন থেকে আগেই মুখ ফিরিয়ে ছিলেন। এবার বাইবেলও তাঁকে আকৃষ্ট করতে পারল না। পশ্চিমাদের চাকচিক্যময় পরিবেশ তাঁকে গ্রাস করতে পারেনি। কুরআনের পথেই তিনি হাঁটা শুরু করলেন। ইসলামী জীবনাদর্শকেই তিনি ব্রত হিসেবে গ্রহণ করলেন। আল্লাহ ও নবীর পথকেই আসল ঠিকানা বানালেন। ১৯৩৭ সাল থেকে ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত ইসলাম প্রচারকাজে নিযুক্ত ছিলেন।

সাংবাদিকতার জনক মাওলানা আকরম খাঁ, খান বাহাদুর আহসানউল্লাহ, মাওলানা মনিরুজ্জামান আনওয়ারী, আব্দুল্লাহিল কাফি আল কুরায়শী প্রমুখ ছিলেন তাঁর শিক্ষাগুরু। ইসলাম গ্রহণের পর আবুল হোসেন ভট্টাচার্য ‘নওমুসলিম তাবলীগ জামাত’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। কিন্তু মুসলিম বিদ্বেষী হিন্দু নেতৃবৃন্দের প্রবল বিরোধিতার মুখে ক্রুসেডার বৃটিশ সরকার সে সংগঠন নিষিদ্ধ করে দেয়। পরবর্তীতে ১৯৬৮ সালে তাঁর নেতৃত্বে ‘ঢাকায় ইসলাম প্রচার সমিতি’ নামে সংস্থা জন্মলাভ করে। তিনি ছিলেন এ সংগঠনের চেয়ারম্যান। নওমুসলিমদের সামাজিক পুনর্বাসনের লক্ষ্যে এ সংগঠন গঠিত হয়। অন্যান্য উদ্দেশ্যের মধ্যে ছিলো- অমুসলিম সমাজে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানো, খৃস্টান মিশনারীদের উদ্দেশ্যমূলক ভ্রান্ত প্রচারণার মোকাবিলা করে উপজাতীয়দের কাছে ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরা এবং সমাজসেবামূলক কাজে শরীক হওয়া।

তিনি ১৯৭৮ সালে মক্কাকেন্দ্রিক রাবিতা-ই আলম আল-ইসলামীর তদানীন্তন সেক্রেটারি জেনারেল শেখ মুহাম্মদ আলী আল হারাকানের আমন্ত্রণক্রমে পবিত্র হজ্ব সম্পন্ন করেন। এর আগে একই বছর তিনি মুসলিম ওয়ার্ল্ড লীগ আয়োজিত করাচিতে অনুষ্ঠিত প্রথম এশীয় ইসলামী সম্মেলনে যোগদান করেন। তিনি বৃটিশ পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ  এ তিন আমলেই সমভাবে ইসলাম প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন। বাংলাদেশ ভারতের লাখ কোটি হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, উপজাতিদের নিকট কুরআনের দাওয়াত পেশ করেন। অসংখ্য দিগ্ভ্রান্ত, পথভ্রান্ত, আদর্শচ্যুত, বিবেকবর্জিত মানুষ তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইসলামের দীক্ষা নেন।

আবুল হোসেন ভট্টাচার্য ছিলেন একাধারে সাহিত্যিক, গবেষক, বিদগ্ধ সমালোচক, সুবক্তা, সমাজসংস্কারক এবং মুক্তিকামী জনতার আশা-আকাঙ্খার প্রতীক। মননশীল লেখক ও চিন্তাবিদ হিসেবে তিনি অনেকগুলো বই রচনা করেছেন। সেগুলো হলা- বিশ্বনবীর বিশ্বসংস্কার, রোযাতত্ত্ব (১৯৪৬), মরুর ফুল (কাব্য, ১৯৪৬), আমি কেন ইসলাম গ্রহণ করলাম (১৯৭৬), আমি কেন খৃস্টধর্ম গ্রহণ করলাম না (১৯৭৭), একটি সুগভীর চক্রান্ত ও মুসলমান সমাজ (১৯৭৭), কারবালার শিক্ষা (১৯৭৮), উদোর পি-ি বুধোর ঘাড়ে (১৯৮০), নবী দিবস (১৯৮১), ইতিহাস কথা কয় (১৯৮১), আর্তনাদের অন্তরালে (১৯৮০), শেষ নিবেদন (১৯৭৯), দীন ধর্ম রিলিজিয়ান (১৯৮২), এপ্রিল ফুলের বেড়াজালে মুসলমান সমাজ (১৯৮৩), কোরবানীর মর্মবাণী (১৯৮১), ঠাকুরমার স্বর্গযাত্রা (১৯৮১), বিড়াল বিভ্রাট (১৯৮১), মূর্তিপূজার গোড়ার কথা (১৯৮২) ইত্যাদি।

১৯৮৩ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি দিনাজপুর সফরে যান। ২৬ শে জানুয়ারি রানীবন্দর থেকে ঢাকা ফেরার পথে পাবনার সমাসনারীতে তাঁর জীপ গাড়িটি রহস্যজনক দুর্ঘটনায় পতিত হয়। এ সময় তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। সম্পূর্ণ অজ্ঞান অবস্থায় ২৭শে জানুয়ারি তাঁকে পিজি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কয়েকদিন পিজিতে চিকিৎসাধীন থাকার পর কিছুটা সুস্থ হলে তাঁকে কলাবাগানস্থ বাসায় আনা হয়। কিছুদিন পর পুনরায় তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটলে তাঁকে ঢাকার মোহাম্মদপুরস্থ রাবিতা মেডিকেল সেন্টারে ভর্তি করা হয়। ১৯৮৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি এখানেই তাঁর জীবনাবসান ঘটে। বনানী গোরস্থানে তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। ১৯৮৪ সালে তাঁকে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ পুরস্কার (মরণোত্তর) প্রদান করা হয়। একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক, বাংলা একাডেমী পদকের যোগ্যতা, কৃতিত্ব থাকা সত্ত্বেও তাঁর ভাগ্যে জুটেনি আজও। একনিষ্ঠ মুসলিম হবার কারণেই তিনি বুদ্ধিজীবী মহলে অনাদরিত, অবহেলিত।